গণেশ চতুর্থী কি এবং কেন পালিত হয়?

গণেশ চতুর্থী, বিনায়ক চতুর্থী নামেও পরিচিত, একটি উৎসব যা নিছক ধর্মীয় পালনের কাজকে অতিক্রম করে এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার রাজ্যে প্রবেশ করে।
![]()
প্রধানতঃ ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে রাজা শিবাজীর (১৬৩০-১৬৮০, মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা) যুগ থেকে পুনেতে উৎসবটি প্রকাশ্যে পালিত হয়ে আসছে। ১৮ শতকে পেশোয়ারা গণেশের ভক্ত ছিল এবং ভাদ্রপদ মাসে তাদের রাজধানী পুনেতে একটি সর্বজনীন গণেশ উৎসব হিসাবে শুরু হয়েছিল। বর্তমানে প্রচুর জমজমাট এবং মহত্ত্বের সাথে উদযাপন করা হয়, এই উৎসবটি প্রভু গণেশের জন্মকে চিহ্নিত করে – জ্ঞান,সিদ্ধি,সমৃদ্ধি এবং বাধা বিঘ্ন দূর করার ক্ষমতার জন্য সম্মানিত দেবতা।
গণেশ চতুর্থী উদযাপনের পিছনে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পগুলির মধ্যে একটি হল দেবী পার্বতী, ভগবান শিবের সহধর্মিণী। পার্বতী স্নান করার সময় রক্ষক হিসাবে কাজ করার জন্য তার শরীরের ময়লা থেকে গণেশকে তৈরি করেছিলেন। তিনি কাদামাটির চিত্রে প্রাণ শ্বাস নিলেন এবং তাকে তার স্নানাগারের প্রবেশদ্বারে পাহারা দেওয়ার জন্য দাঁড় করালেন। ভগবান শিব যখন বাড়িতে ফিরে আসেন, তখন তাকে গণেশ বাধা দেন, যিনি শিবের পরিচয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। এই অচেনা শিশুর সাহসিকতায় ক্রোধান্বিত হয়ে শিব ক্রোধে গণেশের মস্তক ছিন্ন করেন। পার্বতী ঘটনা জানার পর তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। তাকে শান্ত করার জন্য, শিব তার অনুগামীদের প্রথম জীবিত প্রাণীর মাথা আনতে আদেশ দেন,যেটি একটি হাতি ছিল। শিব তখন শিশুটির শরীরে হাতির মাথাটি লাগিয়ে জীবিত করেন। এই কাজটি শুধুমাত্র ভগবান গণেশের জন্মই করেনি বরং তাকে দায়বদ্ধতা এবং মাতৃপ্রেমের প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
শিবপুরাণ – পার্বতী একদিন নন্দীকে দ্বারী নিযুক্ত করে স্নান করতে যান। এমন সময় শিব সেখানে উপস্থিত হয়ে নন্দীকে ধমক দিয়ে পার্বতীর স্নানাগারে প্রবেশ করেন। এতে পার্বতী অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হন। পাঁক তুলে একটি সুন্দর পুত্রের মূর্তি নির্মাণ করেন ও সেই মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে তাকে নিজের বিশ্বস্ত অনুচর নিয়োগ করেন। এরপর একদিন এই বালককে দ্বারী নিয়োগ করে পার্বতী স্নানে গমন করলে শিব তথায় উপস্থিত হন। বালক শিবকে যেতে বাধা দেন। পার্বতীর ইঙ্গিতে যুদ্ধ হয়। বিষ্ণু ও সকল দেবতা এই যুদ্ধে পরাজিত হন। তখন নারদের পরামর্শে বিষ্ণু বালককে মোহাচ্ছন্ন করেন ও শিব ত্রিশূলের দ্বারা তার মস্তক ছেদন করেন। এই সংবাদ শুনে পার্বতী ক্রোধি হয়ে মহাবিশ্ব বিনষ্ট করতে উদ্যোগী হন। নারদ ও দেবগণ তাকে শান্ত করেন। পার্বতী তার পুত্রের পুনর্জীবন দাবি করেন ও এই পুত্র যেন সকলের পূজ্য হয়। শিব তখন সহচরদের উত্তরমুখে প্রেরণ করেন এবং প্রথম দৃষ্ট একটি একদন্ত হস্তিমুণ্ড নিয়ে উপস্থিত হন ও দেবগণ এই হস্তিমুণ্ডের সাহায্যেই তাকে জীবিত করেন।
স্কন্দপুরাণ – স্কন্দপুরাণে গণেশের জন্ম বিষয়ে একাধিক উপাখ্যান বর্ণিত হয়েছে। এই পুরাণের গণেশ খণ্ডে আছে, সিন্দূর নামে এক দৈত্য পার্বতীর গর্ভে প্রবেশ করে গণেশের মস্তক ছিন্ন করে। কিন্তু এতে শিশুটির মৃত্যু ঘটে না, বরং সে মুণ্ডহীন অবস্থাতেই ভূমিষ্ট হয়। জন্মের পরে, নারদ এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে গণেশ তাকে ঘটনাটি জানান। নারদ এরপর তাকে এর একটি বিহিত করতে বললে, সে নিজের তেজে গজাসুরের মস্তক ছিন্ন করে নিজের দেহে যুক্ত করে।
পুরাণের অন্য়মত- পার্বতী নিজের গাত্রমল থেকে একটি সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ পুতুল নির্মাণ করে তাতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেন। এরপর পার্বতী তাকে নিজের স্নানাগারের দ্বাররক্ষকের দায়িত্ব অর্পণ করেন। শিব স্নানাগারে প্রবেশ করতে গেলে বালক তাকে বাধা দেন। শিবের সঙ্গে তার যুদ্ধ হয় ও শিব ত্রিশূলে তার মস্তক ছিন্ন করেন। এরপর গজাসুরকে সামনে পেয়ে শিব তার মস্তক ছিন্ন করেন ও বালকের স্কন্ধে যুক্ত করেন।
বৃহদ্ধর্মপুরাণ – পার্বতী পুত্রলাভে ইচ্ছুক হলে শিব অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। অগত্যা পার্বতীর পীড়াপীড়িতে শিব পার্বতীর বস্ত্র টেনে সেটিকেই পুত্রজ্ঞানে চুম্বন করতে বলেন। পার্বতী সেই বস্ত্রকে পুত্রের আকার দিয়ে কোলে নিতেই সেটি জীবিত হয়ে ওঠে। তখন শিব পুত্রকে কোলে নিয়ে বলেন, এই পুত্র স্বল্পায়ু। উত্তরদিকে মাথা করে শায়িত এই শিশুর মস্তকও তৎক্ষণাৎ ছিন্ন হয়ে যায়। পার্বতী শোকাতুর হন। এমন সময় দৈববাণী হয় যে উত্তরদিকে মাথা করে শুয়ে আছে এমন কারোর মাথা এনে জুড়ে দিলে তবেই এই পুত্র বাঁচবে। পার্বতী তখন নন্দীকে মস্তকের সন্ধানে পাঠান। নন্দী ইন্দ্রের বাহন ঐরাবতের মাথা কেটে আনেন। দেবতারা বাধা দিয়েও ব্যর্থ হন। এই মাথাটি জুড়ে শিব পুত্রকে জীবিত করেন। শিবের বরে, ইন্দ্র ঐরাবতকে সমুদ্রে ফেলে দিলে সে আবার মস্তক ফিরে পায়।

ভাদ্রমাসের শুক্লা চতুর্থীতে ভগবান গণেশ পুনর্জন্ম লাভ করেন। এই জন্য গণেশ চতুর্থীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য গভীর এবং বহু-স্তর বিশিষ্ট। ভগবান গণেশকে \’বিঘ্নহর্তা\’ \’সিদ্ধি বিনায়ক\’ হিসাবে সম্মান করা হয়, যা বাধা অপসারণকারী, এছাড়াও তিনি প্রজ্ঞা, জ্ঞান এবং সমৃদ্ধির দেবতা, এমন গুণাবলী যা লোকেরা তাদের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনে কামনা করে। উৎসবটি আধ্যাত্মিক পুনর্নবীকরণের সময় হিসাবে কাজ করে, যেখানে ভক্তরা তাদের আত্মাকে পরিষ্কার করতে এবং ঐশ্বরিক আশীর্বাদ পেতে প্রার্থনা, আচার এবং উপবাসে নিযুক্ত হন। দশ দিনের উদযাপনকে প্রায়ই আত্ম-উন্নতি এবং ঐশ্বরিক ঘনিষ্ঠতার লক্ষ্যে একটি আধ্যাত্মিক যাত্রা হিসাবে দেখা হয়।




