
সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষের মনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি দোলা দিয়েছে, তা হলো জীবনের অর্থ এবং এর পরিণতি কী। জন্ম যেমন এক পরম বিস্ময়, তেমনি মৃত্যুই এর অনিবার্য সমাপ্তি বা রূপান্তর। রূপক অর্থে জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ দিনের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে তারুণ্যের দীপ্তি ও প্রৌঢ়ত্বের ব্যস্ততা পেরিয়ে বার্ধক্যের গোধূলিলগ্ন হলো সেই ‘শেষ বিকেল’। এই শেষ বিকেলের পথে প্রতিটি মানুষকে একদিন না একদিন পাড়ি জমাতে হয়। এটি এমন এক ধ্রুব সত্য, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

প্রকৃতির নিয়মে ভোর দিয়ে যেমন দিনের শুরু হয়, দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসে এবং অবশেষে সূর্য ডুবে নামে রাত, মানুষের জীবনও ঠিক তেমনি কয়েকটি নির্দিষ্ট অধ্যায়ের সমষ্টি। শৈশবের লগ্ন কেটে যায় অপ্রতিরোধ্য খেলায়, কৈশোর ও যৌবন ছড়ায় তারুণ্যের তেজ ও রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু সময়ের স্রোতে বয়ে চলা জীবন একদিন তার মধ্যাহ্ন পেরিয়ে ঢোকে পশ্চিমাকাশের ছায়ায়। এই শেষ বিকেলে এসে চারপাশের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। কোলাহলপূর্ণ পৃথিবী যেন একটু শান্ত হয়ে আসে। মানুষ তখন পেছনে ফেলে আসা পথটার দিকে তাকিয়ে হিসাব মেলাতে বসে—কী পাওয়া হলো, আর কী হলো না! এই সময়টি যেমন স্মৃতিকাতরতার, তেমনই গভীর এক উপলব্ধির।

পৃথিবীর তাবৎ বৈচিত্র্য, রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র কিংবা ক্ষমতাধর ও সাধারণ মানুষ—সবার জন্যই এই শেষ বিকেলের পথ সমানভাবে নির্ধারিত। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে কেউ এই পথযাত্রাকে দীর্ঘায়িত করতে পারে না, আবার কেউ চাইলেই একে এড়িয়ে চলতে পারে না। বিত্ত-বৈভব বা ক্ষমতার দেয়াল তুলে মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। এই সত্যটি মানবজাতিকে বিনয়ী হতে শেখায় এবং অহংকারকে চূর্ণ করে দেয়। শেষ বিকেলের এই পথ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা এই পৃথিবীতে মুসাফির মাত্র; স্থায়ী নিবাস এখানে কারও নয়।
দিনের শেষ আলোয় যেমন চারপাশের প্রকৃতি এক অন্যরকম রূপ ধারণ করে, তেমনি জীবনের অন্তিম সময়ে মানুষের মনও হয়ে ওঠে নরম ও প্রজ্ঞাবান। এই সময়ে মানুষ উপলব্ধি করে, জাগতিক অর্জনের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান হলো মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা, অন্যের মুখে হাসি ফোটানো এবং ক্ষমা ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।
অতীতে ঘটে যাওয়া ভুলত্রুটিগুলোর জন্য অনুশোচনা এবং আগামী দিনের বা পরকালের মুক্তির ভাবনা মানুষকে আত্মশুদ্ধির পথে চালিত করে। শেষ বিকেলের পথ কেবল শেষের ঘোষণা নয়, এটি জীবনকে নতুন করে মূল্যায়ন করার এবং নিজের ভেতরের মানবসত্তাকে জাগিয়ে তোলার মোক্ষম সময়।
‘সবাই একদিন পাড়ি জমাতে হবে শেষ বিকেলের পথে’—এই কথাটি যেমন বিষাদের, তেমনই তা গভীর সান্ত্বনার ও প্রাপ্তির। কারণ, জীবনের একটি নির্দিষ্ট সমাপ্তি আছে বলেই এর প্রতিটি মুহূর্তের এত মূল্য। শেষ বিকেলের এই অবধারিত যাত্রাকে ভয় না পেয়ে, জীবনকে সৎকর্মে, ত্যাগে ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ করে তুলি—এটাই হোক মানবজীবনের প্রকৃত সার্থকতা। গোধূলির আলোয় মিশে যাওয়ার আগে আমাদের পথচলা যেন হয় অর্থবহ এবং সুন্দর।




