মহান স্রষ্ট্রার প্রেরিত নারী শক্তি মাতা দুর্গা দেবী,
শারদীয় দুর্গা পূজা অহিংসা-অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলার উৎসব- দীপঙ্কর শীল

লেখক- দীপঙ্কর শীল,
যখনেই পৃথিবীতে অন্যায়, অত্যাচার-অবিচার তথা অধর্মের মাত্রা বেড়ে যায় তখনি মহান স্রষ্টা বিভিন্ন রূপে তাঁর পক্ষ থেকে অবতার হিসেবে আবির্ভূত হয় বিভিন্ন দেব-দেবী। ঠিক তেমনি অধর্ম ও অন্যায়-অত্যাচারের রাজা মহিষাসুরকে বিনাশ করতে দেবী দুর্গার মর্তে আগমন ঘটিয়েছিলেন মহান স্রষ্টা বা ঈশ্বর।

তখন থেকে দেবী দুর্গার আরাধনা ও মহিষাসুরের বিনাশের স্মরণে উদযাপিত হয়। দেবী দুর্গা নারী শুভশক্তি, ন্যায় ও সাহসের প্রতীক। হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি খ্রিষ্ট্রান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও পূজার আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। বিভিন্ন পূজা মন্ডপে সকল ধর্মের মানুষের উৎসবমূখর পদচারনা লক্ষ্য করা যায়।

সনাতন ধর্মানুসারীরা তাদের পূজাতে প্রতিরুপ হিসেবে মাটির প্রতিমা’কে দেব-দেবী কল্পনা করে মহান স্রষ্টার বিশেষ শক্তির অবতারের প্রতি প্রার্থনায় জীব-জগতের, সকল ধর্মের, সকল প্রাণীর মঙ্গল ও শুভ কামনায় পূজা করে থাকে। দুর্গাপূজা বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ ভারতীয় উপমহাদেশ ও বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রে পালিত হয়ে থাকে।
সনাতন ধর্মানুসারীদের বড় আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব দুর্গা দেবী’র পূজা। শরৎ কালের শুরুর সময় থেকেই প্রকৃতি যেন দেবী দুর্গার আগমনের আভাস দিতে শুরু করে। বিশ্বের যে সকল দেশে সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে সেখানে কর্ম সূত্রে নিজের বাড়ি থেকে দূরে থাকলেও পুজোর সময় ঠিক নিজের বাড়ি বা এলাকায় আসে দুর্গা পূজা দেখতে, কারণ সারা বছর যে যেখানেই থাক না কেনো, পুজোর সময় নিজের বাড়িতে মা বাবা স্ত্রী সন্তানদের সাথে থাকার যে আনন্দ সেটা অন্য কোথাও থেকে পাওয়া যায় না।

হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ দুর্গা পূজায় ধনী গরীব সকলে এক হয়ে আনন্দে বিভিন্ন পূজা মন্ডপে মাতা দুর্গার দর্শন করেন। থাকেনা কোন ধনী গরীব ভেদাভেদ। মাতা দেবী দুর্গা পূজা শারদীয়া উৎসব নামেও পরিচিত সকল ধর্মের মানুষের নিকট, আনন্দ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবেও আয়োজন করা হয় বিভিন্ন সুন্দর ও নিরাপত্তার বিষয়টি। বাঙালিরা বিশেষ করে হিন্দু ধর্মের মানুষ সারাবছর ধরে এই একটি উৎসবের অপেক্ষায় থাকে। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের তিথি, দশমী পর্যন্ত পালন করা হয় সনাতন ধর্মের মানুষের এই ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। দুর্গা পুজোর আগে আমাবস্যার দিনটিকে মহালয়া হিসেবে পালন করা হয়।
দুর্গা পূজার সূচনা কথা বলতে গেলে রামায়ণে বর্ণিত অনুযায়ী শ্রীরাম চন্দ্র বনবাসে থাকাকালীন মাতা সীতাকে উদ্ধারের জন্য শরৎকালে লঙ্কাপতি রাবনের সাথে যুদ্ধের পূর্বে দেবী দুর্গার অকাল বোধন করেছিলেন। সময়টি শরৎকালে হয়েছিল বলে শারদীয়া দুর্গাপূজা বলা হয়।

একসময় গ্রামে গঞ্জে তথা সকল স্থানেই বাঙালিদের মধ্যে বাসন্তী পূজার প্রচলন ছিল বেশি, কিন্তু ক্রমে শ্রীরাম চন্দ্রের শারদীয় দুর্গাপূজা জনপ্রিয় হয় এবং সনাতনী সম্প্রদায় এই পূজা বড় আয়োজনে করে থাকে। তবে এখনও ভারতের ধনী পরিবারে বাসন্তী পূজার আয়োজন সাড়ম্বরে করে থাকে। দুর্গা দেবীর পূজা শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত। ষষ্ঠী, মহা সপ্তমী, মহা অষ্টমী, মহা নবমী এবং বিজয়া দশমীতে মাতা দুর্গার প্রতিরুপ প্রতিমা বিসর্জনের মধ্যে দিয়ে সমাপ্তি ঘটে শারদীয় দুর্গা পূজার আয়োজন। দেবী দুর্গা মর্তে আসেন সপরিবার নিয়ে। মূর্তি বা প্রতিমা মধ্যস্থলে থাকেন দেবী দুর্গা এবং সাথে মায়ের বাহন সিংহ ছাড়াও মায়ের ডান পাশে থাকে বাহন পেঁচা সহ মা লক্ষ্মী ও বাহন ইঁদুর সহ সিদ্ধিদাতা গণেশ এবং বাম পাশে ময়ূরের সাথে কার্তিক ও প্রিয় বাহন হাঁস সহ বিদ্যাদেবী সরস্বতী, মায়ের পদতলে ত্রিশূল বিদ্ধ অবস্থায় দেখা যায় মহিষাসুরকে। মহিষাসুর বধের জন্য সর্ব দেবতা মিলে দেবী দুর্গাকে দশ রকম অস্ত্র দিয়েছিলেন। তাই দশভূজা নামেও দেবী পরিচিত। দুর্গা পূজা দশমী অবধি পুজো চলে, পুজা শেষে নারীদের মঙ্গলার্থে মায়ের কাছ থেকে সিঁদুর নিয়ে কপালে দেয়া হয় যেন সিঁদুর নিয়ে জীবনের শেষ অবধি ভালো থাকে স্বামীর সহিত।
দেবী দুর্গা পূজা ইউনেস্কোর ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করা হয়। সদ্য সমাপ্ত হয়ে যাওয়া দুর্গা পূজা বাংলাদেশে নির্বিঘ্নে ও উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে সাড়ম্বরে পালন করেছে হিন্দু ধর্মের মানুষ। রাষ্ট্র বিভিন্নভাবে উৎসাহ প্রদান করার মাধ্যমে কঠোর প্রশাসনিক নিরাপত্তায় সনাতনী সম্প্রদায় সুন্দরভাবে বড় আয়োজনে দুর্গা দেবী’র বিজয়া দশমী পর্যন্ত পালন করেছে। যা এ যাবতকালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুন্দর নজির সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশে। প্রায় প্রতিটি পূজা মন্ডপে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়াও খ্রিষ্ট্রান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা নিয়ে পূজার আনন্দ ও উৎসব উদযাপন করেছে। যা বাংলাদেশের সকল ধর্মের মানুষের জন্য বিষয়টি সুন্দর ও ইতিবাচক।




