অন্যান্য

কেন ধর্ম যার যার উৎসব সবার এর তাৎপর্য কি?

অর্থনৈতিক দিক থেকেও উৎসব সবার"-নিমাই মজুমদার।

“ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”—এই কথাটির মাধ্যমে মূলত একটি অসাম্প্রদায়িক, বহুত্ববাদী এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থার মূল ভাবনাকে প্রকাশ করা হয়।

​ধর্ম প্রতিটি মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গা। প্রত্যেকে তাঁর নিজের ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান ও উপাসনা স্বাধীনভাবে পালন করবেন—এটাই ধর্মের স্বাধীনতা। অন্যদিকে, উৎসব হলো আনন্দ, মিলন ও ভালোবাসার উপলক্ষ, যা মানুষের মাঝে দূরত্ব কমিয়ে কাছাকাছি নিয়ে আসে।

​ বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো বহুসাংস্কৃতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আবহাওয়ায় বিভিন্ন ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে একসাথে বসবাস করে আসছে। দুর্গাপূজা, ঈদ, বড়দিন কিংবা বৈশাখ—সব উৎসবই এ দেশের মানুষের সম্মিলিত সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। তাই আনন্দের রঙে কোনো দেয়াল থাকে না।

​উৎসবের মূল বার্তা হলো আনন্দ ভাগ করে নেওয়া, সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং একে অপরের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো। উৎসবের খাবার, শুভেচ্ছা বিনিময়, মেলা কিংবা আনন্দঘন পরিবেশের সাথে ধর্মের আচার সরাসরি যুক্ত থাকে না; এগুলো সব মানুষের জন্যই উন্মুক্ত।
​ধর্ম মানুষকে ভালো মানুষ হতে শেখায় এবং পরমতসহিষ্ণুতা শেখায়। “উৎসব সবার” বলার মাধ্যমে বোঝানো হয় যে, অন্যের আনন্দে অংশ নিতে বা আনন্দ উপভোগ করতে ধর্ম বাধা হতে পারে না, বরং এটি আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও “উৎসব সবার” ধারণাটি শতভাগ সত্য। কারণ কোনো বড় উৎসবই একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা বৃহত্তর সমাজের অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
​পূজা বা যেকোনো বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে অর্থনীতির সাথে সর্বস্তরের মানুষের সম্পৃক্ততা কাজ করে:

​সবার অংশগ্রহণে কর্মসংস্থান ও পেশাগত বৈচিত্র্য: পূজাকে কেন্দ্র করে প্যান্ডেল তৈরি, বাঁশ-কাঠের জোগান, আলোকসজ্জা, প্রতিমাশিল্প, সাউন্ড সিস্টেম এবং রূপসজ্জার কাজ—প্রতিটি ধাপে নানা ধর্ম ও পেশার মানুষ যুক্ত থাকেন। দেখা যায়, অনেক কারিগর বা শ্রমিক অন্য ধর্মের হলেও এই উৎসবের কাজের মাধ্যমেই তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করেন।

​বাজার ও ব্যবসার প্রসার: পূজার কেনাকাটাকে কেন্দ্র করে পোশাকের বাজার, জুতা, গহনা, প্রসাধনী এবং মিষ্টির দোকানগুলোতে বেচাকেনা বহুগুণ বেড়ে যায়। এই ব্যবসায়িক লভ্যাংশ বা অর্থের প্রবাহ শুধু এক সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং পাইকারি বিক্রেতা, খুচরা দোকানদার, দর্জি, তাঁতি থেকে শুরু করে খেটে খাওয়া মানুষের পকেট পর্যন্ত পৌঁছায়।

​পরিবহন ও সেবা খাতের গতিশীলতা: উৎসবের দিনগুলোতে মানুষের যাতায়াত বাড়ে, প্যান্ডেলে ঘোরাঘুরি বা কেনাকাটার জন্য রিকশা, সিএনজি, বাস কিংবা অন্যান্য পরিবহন ব্যবহার হয়। এর ফলে পরিবহন শ্রমিক ও চালকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। এ ছাড়া ছোট ছোট খাবারের দোকান, হকার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও এ সময় ভালো ব্যবসা করতে পারেন।

​অর্থনীতিবিদদের মতে, যেকোনো বড় উৎসব জাতীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বড় ভূমিকা রাখে। একেকটি উৎসব কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন ও সেবা খাতের চাহিদা তৈরি করে, যা পুরো দেশের অর্থনৈতিক চক্রকে সচল রাখে।
​সংক্ষেপে, পূজার সময় যে খরচ বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘটে, তার সুফল বা প্রভাব পুরো সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আনন্দ যেমন সবার, তেমনি উৎসবের অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ ও সুফলও সব মানুষের জীবন ও জীবিকার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

​সংক্ষেপে বলতে গেলে, ধর্ম যার যার বিশ্বাসের জায়গা থেকে আলাদা হলেও, আনন্দ, উৎসব এবং মানুষে মানুষে মিলনের আনন্দ সবার—এই সার্বজনীন মানবিক দর্শন থেকেই কথাটির উৎপত্তি।

আরো দেখুন

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button