অন্যান্য

রাজপ্রসাদ থেকে গঙ্গাতীর দন্ড যখন হয়ে ওঠে প্রেমের পরম সোপন

রাজপ্রসাদ থেকে গঙ্গাতীর
দন্ড যখন হয়ে ওঠে প্রেমের পরম সোপন

রাহুল কৃষ্ণ দাস।

শ্রীপাট পানিহাটির গঙ্গাতীরে আজ ধূলিকণায় অমৃতের ছোঁয়া। ষড় গোস্বামীর অন্যতম রত্ন, বৈরাগ্যের অগ্নিশিখা শ্রীল রঘুনাথ দাস গোস্বামীর সেই ঐতিহাসিক ‘চিড়া-দধি দণ্ড মহোৎসব’।

আজকের এই দিনটি কেবল উৎসবের নয়, এটি ভক্তের হৃদয় থেকে অহংকারের সমস্ত আগল ভেঙে প্রেমাস্পদকে খুঁজে পাওয়ার এক ব্যাকুল আর্তি।

সপ্তগ্রামের রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্য আর লৌকিক সুখের মোহের মাঝেও রঘুনাথের প্রাণ পড়ে থাকত অন্য কোনো অতলান্তিক গভীরে। তাঁর অন্তরে বৈরাগ্যের প্রথম স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়েছিলেন স্বয়ং নামাচার্য শ্রীল হরিদাস ঠাকুর।
শৈশবে কুলপুরোহিত বলরাম আচার্যের গৃহে হরিদাস ঠাকুরের শ্রীচরণ দর্শনই রঘুনাথের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। হরিদাস ঠাকুরের সেই কৃপাময় দৃষ্টি যেন রঘুনাথের চোখের সামনের মায়ার পর্দাখানা চিরতরে ছিঁড়ে দিয়েছিল। সেই থেকে মহাপ্রভুর চরণের জন্য এক অতৃপ্ত তৃষ্ণা তাঁর রক্তে-মাংসে মিশে গিয়েছিল।

সপ্তগ্রামের রাজপ্রাসাদ ছিল তৎকালীন বৈভবের চরম শিখর। দেবরাজ ইন্দ্রের অমরাবতীকেও ম্লান করে দেওয়া ঐশ্বর্য, তরুণী বধূর প্রেমময় চাহনি—সংসারের সবটুকু মায়া যেন রঘুনাথকে বন্দি করে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু যাঁর হৃদয়ে মহাপ্রভুর জন্য তৃষ্ণা জেগেছে, তাঁকে কি পার্থিব কোনো মণি-মুক্তোয় বেঁধে রাখা যায়?

অদ্বৈত নিকেতনে কয়েকবার পালিয়ে গিয়েও মহাপ্রভুর আদেশে তাঁকে সংসারে ফিরতে হয়েছিল। পিতা, মাতা, জেঠা মরিয়া হয়ে তাঁকে সাংসারিক মায়ায় জড়াতে এক রূপসী তরুণীর সাথে বিয়ে দিলেন। এমনকি ১১ জন প্রহরী নিয়োগ করা হলো—যদি রঘুনাথ আবার অদৃশ্য হয়ে যান!
কিন্তু কোনকিছুই যখন তাঁকে সংসারে বাঁধতে না পেরে অসহায় হয়ে গিয়েছিলো, তখন ​রঘুনাথের জননী আর্তনাদ করে বলেছিলেন, “ওগো আমার রঘুনাথ পাগল হয়ে গিয়েছে, ওকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখো।”

রঘুনাথের পিতা বিষণ্ণ; অথচ অমোঘ কণ্ঠে বলেছিলেন—

ইন্দ্রসম ঐশ্বর্য, স্ত্রী অপ্সরা সম।
এ সব বান্ধিতে নারিলেক যাঁর মন।।
দড়ির বন্ধনে তারে রাখিবা কেমতে?
জন্মদাতা পিতা নারে প্রারব্ধ খণ্ডাইতে।।
চৈতন্যচন্দ্রের কৃপা হঞাছে ইহারে।
চৈতন্যচন্দ্রের বাতুল কে রাখিতে পারে।।

[চৈতন্যচরিতামৃত অন্ত্য লীলা ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ]

শ্রীল রঘুনাথ দাস কি করে সংসার হতে মুক্ত হবেন চিন্তা করছিলেন, হঠাৎ সংবাদ এলো পানিহাটিতে এক পরম দয়াল এসেছেন। তাঁর নাম শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভু। পতিতপাবন নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা হলেই সংসারে মুক্তি সম্ভব বিচার করে রঘুনাথ দাস পানিহাটিতে ছুটে গেলেন। গঙ্গার তীরে শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভু বট বৃক্ষের নিচে ভক্তগণ পরিবেষ্টিত হয়ে বসে আছেন। রঘুনাথ দাস দূর হতে নিত্যানন্দ প্রভুকে দণ্ডবৎ করলেন।

শ্রীমন্ নিত্যানন্দ প্রভু মৃদু হেসে বললেন-

নিকটে না আইস চোরা, ভাগ দূরে দূরে।
আজি লাগ্ পাঞাছি দণ্ডিমু তোমারে।।
দধি, চিড়া ভক্ষণ করাহ মোর গণে।
শুনিয়া আনন্দ হৈল রঘুনাথের মনে।।

[চৈতন্যচরিতামৃত অন্ত্যলীলা ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ]

পানিহাটির সেই বটবৃক্ষতলে নিত্যানন্দ প্রভু যখন রঘুনাথকে ‘চোর’ বলে সম্বোধন করলেন, তখন তা ছিল অন্ধকার রাতে ধ্রুবতারার আবির্ভাব।
প্রভু বলেছিলেন— “আজি লাগি পাঞাছি, দণ্ডিমু তোমারে।” এই শাসন কি কোনো শাস্তি? না!

এটি ছিল এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন। লৌকিক বিচারে দণ্ড মানেই বিচ্ছেদ, কিন্তু আধ্যাত্মিক রসতত্ত্বে এটি এক পরম কৃপা। প্রভু রঘুনাথকে শিখিয়ে দিলেন, গুরু-বৈষ্ণবকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ভগবানকে পাওয়ার চেষ্টা এক ধরণের আধ্যাত্মিক ‘চৌর্যবৃত্তি’।

চিড়া আর দধির সেই অকিঞ্চিৎকর ভোগ কি কেবলই খাদ্য? না, সেটি ছিল রঘুনাথের রাজকীয় অহংকার বিসর্জনের এক মহা-যজ্ঞ।

কোটিপতি জমিদারের উত্তরাধিকারী গঙ্গার ঘাটে মাটির সানকি হাতে অগণিত সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিলেন—এ যেন সাগরের মুক্তো পাওয়ার জন্য নিজের অহং-এর ঝিনুক ভেঙে ফেলার প্রস্তুতি। এই সেবার প্রতিটি কণায় ছিল মহাপ্রভুর সূক্ষ কৃপার স্পর্শ। আর ঠিক তখনই, নিত্যানন্দ প্রভুর সেই চরণস্পর্শী ‘দণ্ড’ রঘুনাথের ললাটে এক চিন্ময় রাজতিলক হয়ে শোভা পেয়েছিল।

তুমি যে করাইলা এই পুলিন ভোজন।
তোমায় কৃপা করি গৌর কৈলা আগমন।।
কৃপা করি কৈলা চিড়া দুগ্ধ ভোজন।
নৃত্য দেখি রাত্র্যে কৈলা প্রসাদ ভক্ষণ।।
তোমা উদ্ধারিতে গৌর আইলা আপনে।
ছুটি তোমার যত বিঘ্নাদি- বন্ধনে।।
স্বরুপের স্থানে তোমা করিবে সমর্পণে।
অন্তরঙ্গ ভৃত্য বলি রাখিবে চরণে।।
নিশ্চিন্ত হঞা যাহ্ আপন ভবন।
অচিরে নির্বিঘ্নে পাবে চৈতন্য-চরণ।।

[চৈতন্য চরিতামৃত অন্ত্যলীলা ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ]

নিতাই চাঁদ রঘুনাথ দাস গোস্বামীকে শ্রীল স্বরুপ দামোদরের নিকটে সঁপে দিয়েছিলেন। গুরুর চরণের স্পর্শে রঘুনাথের জাগতিক ও মানসিক সমস্ত বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল। তাই এই দণ্ড কোনো নিগ্রহ নয়, এ হলো ভক্তের হৃদয়ের আনুগত্যহীনতাকে হরণ করে তাকে ভগবানের সেবার যোগ্য করে তোলার এক অলৌকিক চাবিকাঠি—দণ্ডের আবরণে এক পরম আশীবার্দ।

​ভগবদ্-সান্নিধ্যের একমাত্র সোপান গুরু বৈষ্ণবের কৃপা।
​এই মহোৎসবের অন্তরালে যে পরম মনস্তাত্ত্বিক ও পারমার্থিক সত্যটি প্রচ্ছন্ন রয়েছে, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক শাশ্বত দর্শন। রঘুনাথ দাস গোস্বামী পরম ব্যাকুলতায় বারবার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সাক্ষাৎ সান্নিধ্য পেতে চেয়েছেন, কিন্তু বারবারই তাঁকে ফিরে আসতে হয়েছে। কেন এই প্রতীক্ষা? কেন এই ব্যর্থতা? এই উৎসব তারই উত্তর দেয়।

​বৈষ্ণব দর্শনের মূল কথাই হলো—গুরু এবং বৈষ্ণবের করুণার দুয়ার পার না হয়ে সরাসরি ভগবানের মন্দিরে প্রবেশ করা যায় না। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হলেন সাধ্য বস্তু, আর শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু হলেন আদি গুরুতত্ত্ব—যিনি সেই সাধ্যের কাছে পৌঁছানোর একমাত্র সেতু। রঘুনাথ যতই ধনী, সদাচারী বা অন্তরে ব্যাকুল হোন না কেন, যতক্ষণ না তিনি এই গুরুতত্ত্বের কৃপা লাভ করছেন, ততক্ষণ মহাপ্রভুর অপ্রাকৃত রাজ্যে তাঁর প্রবেশাধিকার মিলছিলো না।


চিড়া দধি দণ্ড মহোৎসব’ কোনো লৌকিক ভোজ বা শাস্তির ইতিহাস নয়। এটি হলো সাধকের আত্মনিবেদনের মহাকাব্য। এটি আমাদের শেখায়, পরমেশ্বরের কৃপা কোনো ব্যক্তিগত সাধনার একাকী অহংকার দিয়ে কেনা যায় না; তা পেতে হলে গুরু-বৈষ্ণবের চরণে নিজেকে সমর্পণ করতে হয়, নিজেকে ধূলিসাৎ করতে হয়। রঘুনাথের ললাটে নিত্যানন্দ প্রভুর চরণস্পর্শের সেই ‘দণ্ড’ আসলে ছিল এক চিন্ময় রাজতিলক, যা তাঁকে সংসার থেকে মুক্ত করে মহাপ্রভুর খাস দরবারে পৌঁছে দিয়েছিল।

এই উৎসবের মূল সুর তাই শাস্তির কর্কশ ধ্বনি নয়, তা হলো কৃপার এক সুমধুর ও অবিনশ্বর ঝংকার।

গুরু-বৈষ্ণব কৃপা ব্যতিত এ জগতে কিছুই লাভ করা সম্ভব নয়। পানিহাটির এই মহোৎসব আমাদের শেখায়, ভগবানের মন্দিরের দুয়ার গুরুর করুণার চাবি ছাড়া খোলে না। আজকের এই মহোৎসবে দাঁড়িয়ে আমাদের উপলব্ধি হোক—যখনই রঘুনাথের মতো আমরা নিজের ক্ষুদ্র ‘আমি’কে গঙ্গার পবিত্র জলে বিসর্জন দিয়ে অন্যের সেবায় আনন্দ খুঁজে পাব, তখনই বুঝতে হবে আমাদের উপরও সেই পরম কৃপার দণ্ড নেমে এসেছে।

​এটি শাস্তির কর্কশ ধ্বনি নয়, এটি অন্তরের গহীনে বয়ে চলা এক অবিনশ্বর প্রেমের সুর। রাজপ্রাসাদের মোহ ছেড়ে গঙ্গাতীরের এই দীনাতিলীলা—দণ্ড যখন হয়ে ওঠে প্রেমের পরম সোপান, তখন জীবনের সার্থকতা এভাবেই মহাপ্রভুর চরণে গিয়ে মেশে।

[রাহুল কৃষ্ণ দাস]
আরো দেখুন

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button